
নিজস্ব প্রতিবেদক :—
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, বর্তমান সরকার ‘শিষ্টের পালন ও দুষ্টের দমন’ এবং ‘পুরস্কার ও তিরস্কার’ (Reward and Punishment) নীতিতে বিশ্বাসী। এই নীতির আলোকে নৈতিক মনোবল বৃদ্ধির মাধ্যমে পুলিশ বাহিনীকে আরও সেবামুখী ও জনবান্ধব করতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করছে। ভালো কাজের স্বীকৃতি এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের এই প্রক্রিয়া পুলিশ সদস্যদের আরও দায়িত্বশীল, আন্তরিক ও ন্যায়নিষ্ঠ হতে উৎসাহিত করবে।
সোমবার (৮ জুন) বাংলাদেশ সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে সাম্প্রতিক দেশব্যাপী আলোচিত তিনটি ঘটনায় পুলিশ সদস্যদের প্রশংসনীয় অবদান ও কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে মন্ত্রী জানান, তিনটি বিশেষ কৃতিত্বপূর্ণ ঘটনায় মোট ১৫ জন পুলিশ সদস্যকে সনদ ও আর্থিক পুরস্কার প্রদান করা হয়েছে। পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রত্যেককে মন্ত্রণালয়ের বিশেষ তহবিল থেকে ২০ হাজার টাকা করে অনুদান দেওয়া হয়। এছাড়া তিনজন নৌ পুলিশ সদস্যকে আইজি ব্যাজ (IG Badge) প্রদান করা হয়েছে।
তিনি বলেন, অতীতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে এ ধরনের অনুষ্ঠান সচরাচর অনুষ্ঠিত হয়নি। সাধারণত রাজারবাগ পুলিশ লাইনস বা পুলিশ সদর দপ্তরের বার্ষিক অনুষ্ঠানে পদক ও ব্যাজ প্রদান করা হয়ে থাকে। তবে মাঠপর্যায়ে কর্মরত পুলিশ সদস্যদের তাৎক্ষণিকভাবে উৎসাহিত করা এবং তাদের নৈতিক মনোবল আরও সুদৃঢ় করার লক্ষ্যে মন্ত্রণালয় এ উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, গত ৫ আগস্টের পর পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি নিয়ে যে সংকট তৈরি হয়েছিল, তা কাটিয়ে উঠতে সরকার সফল হয়েছে। বর্তমানে পুলিশ আগের তুলনায় অনেক বেশি জনবান্ধব এবং জনগণের আস্থা অর্জনে সক্ষম হয়েছে। তিনি জানান, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের তুলনায় বর্তমান সময়ে দেশের অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনের বিষয়ে তিনি বলেন, টিআইবি কোনো সরকারি সংস্থা নয়। মাঠপর্যায়ে তদন্ত ছাড়াই শুধুমাত্র সংবাদপত্রের তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করা হলে তার নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায়। তবে গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিটি সংবাদ সরকার গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে এবং প্রয়োজন হলে তা যাচাই-বাছাই করা হয়।
মামলা তদন্তে বরাদ্দের সীমাবদ্ধতার বিষয়ে তিনি বলেন, জাতীয় অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও বাজেট সীমাবদ্ধতার কারণে তদন্ত, পোস্টমর্টেম ও অন্যান্য কার্যক্রমে বিদ্যমান বরাদ্দ পুরোপুরি পর্যাপ্ত নয়। তবে ভবিষ্যতে তদন্ত কার্যক্রম, পোস্টমর্টেম এবং পুলিশি টহল আরও কার্যকর করতে বরাদ্দ বৃদ্ধির বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
পলাতক ও শৃঙ্খলাভঙ্গকারী পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়ে এক প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, এ ধরনের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের অনুকম্পা দেখানো হবে না। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে একাধিক বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম শেষ পর্যায়ে রয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে আইসিটি আইন বা দণ্ডবিধির আওতায় মামলা রয়েছে, তারা প্রচলিত আইন অনুযায়ী আদালতে বিচারের সম্মুখীন হবেন। অপরাধী যেই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না।
পুরস্কারপ্রাপ্ত তিনটি আলোচিত ঘটনা
১. পল্লবী থানার রামিসা ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড
অল্প সময়ের মধ্যে আসামি গ্রেপ্তার, ডিএনএ পরীক্ষা ও ময়নাতদন্ত সম্পন্ন, ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণ এবং সফল তদন্তের মাধ্যমে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে সহায়তা করার জন্য পল্লবী জোনের সহকারী পুলিশ কমিশনার মো. জাহিদ হোসেন, এসআই (নিরস্ত্র) অহিদুজ্জামানসহ মিরপুর জোনের আভিযানিক দলের ৯ জন কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়।
২. দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে নৌ পুলিশের বীরত্ব
ঈদুল আজহার পর নিয়মিত দায়িত্ব পালনকালে দৌলতদিয়া ফেরিঘাটে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে একটি যাত্রীবাহী বাস দ্রুত খালি করে অন্তত ৫০ জন যাত্রীর জীবন রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার জন্য মাদারীপুরের চর জানাজাত ও কলাতলা নৌ পুলিশ ফাঁড়ির এসআই (নিরস্ত্র) মোহাম্মদ আবুজার গিফারীসহ তিনজন নৌ পুলিশ কর্মকর্তাকে সম্মাননা দেওয়া হয়।
৩. মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় ক্লুলেস কিশোরী হত্যাকাণ্ড
নদী থেকে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতনামা কিশোরীর পরিচয় শনাক্তকরণ, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাত্র এক দিনের মধ্যে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ ও হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন এবং চার আসামিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি নিশ্চিত করার জন্য পিবিআই মুন্সীগঞ্জের এসআই (নিরস্ত্র) রনি দেবনাথসহ তিনজন কর্মকর্তাকে পুরস্কৃত করা হয়।
অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (রুটিন দায়িত্ব) ড. জিয়াউদ্দিন আহমদ, পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির, ডিএমপি কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদসহ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
Leave a Reply