
(মোঃ সোলাইমান চট্টগ্রাম)
দেশজুড়ে এক অস্বস্তিকর সত্য দিন দিন স্পষ্ট হচ্ছে—সাংবাদিকতা আজ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা নয়, বরং টার্গেটেড পেশায় পরিণত হয়েছে। তথ্য সংগ্রহ করতে গেলেই হামলা, হুমকি, মামলার ভয়; আর উল্টো দিক থেকে অপরাধীরা বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। প্রশ্নটা সরাসরি—রাষ্ট্র কি সত্য প্রকাশকারীদের রক্ষা করতে ব্যর্থ, নাকি ইচ্ছাকৃতভাবে নীরব?
হামলার শিকার সত্য, নিরাপদ অপরাধী
মাঠে কাজ করা সাংবাদিকদের অভিজ্ঞতা একটাই—দুর্নীতি, মাদক, চাঁদাবাজি, বালু-মহাল বা ভূমি দখল নিয়ে প্রতিবেদন করতে গেলেই “চুপ থাকার” বার্তা আসে। না শুনলে হামলা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, হামলাকারীরা ধরা পড়লেও দ্রুতই প্রভাব খাটিয়ে পার পেয়ে যায়। বিপরীতে, ভুক্তভোগী সাংবাদিকই হয়রানির শিকার হন—জেরা, মামলা, সামাজিক অপপ্রচার।
আইনহীনতার সুযোগে বেপরোয়া চক্র
বাংলাদেশে সাংবাদিক সুরক্ষায় আলাদা, কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য আইন নেই—এই শূন্যতাই এখন অপরাধীদের ঢাল। “সংবাদ প্রকাশ”কে অপরাধ বানিয়ে দেওয়ার প্রবণতা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। একটি সংঘবদ্ধ চক্র পরিকল্পিতভাবে সাংবাদিকদের ‘চাঁদাবাজ’ তকমা দিয়ে জনমত বিভ্রান্ত করছে, যাতে সত্য প্রতিবেদনগুলোকে অগ্রাহ্য করা যায়। এর পেছনে কারা—দুর্নীতিবাজ, মাদক কারবারি, নাকি তাদের আশ্রয়দাতা—তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
দালালচক্র বনাম সত্যের কণ্ঠ
সবচেয়ে উদ্বেগজনক হলো—কিছু স্বার্থান্বেষী মধ্যস্বত্বভোগী (দালালচক্র) সরাসরি অপরাধীদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে সাংবাদিকদের টার্গেট করছে। যারা অপরাধের বিরুদ্ধে লেখেন না, তারা “ভালো সাংবাদিক”; আর যারা সত্য তুলে ধরেন, তারাই “সমস্যা”—এই বিকৃত মানদণ্ড তৈরি করা হয়েছে ইচ্ছাকৃতভাবে। এতে করে সমাজে সত্য-অসত্যের সীমারেখা ধোঁয়াশা হয়ে যাচ্ছে।
প্রশাসনের ভূমিকা—প্রশ্নের মুখে নিরপেক্ষতা
অনেক ক্ষেত্রে অভিযোগ উঠছে—সাংবাদিক নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত, দৃশ্যমান ও দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা দেখা যায় না। বরং তদন্তের নামে ভুক্তভোগীকেই জিজ্ঞাসাবাদের চক্রে ফেলা হয়। এতে করে একটি বার্তা যায়—“সত্য বললে বিপদ তোমারই।” এই মনোভাব গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সরাসরি হুমকি।
সংগঠন আছে, সংহতি কোথায়?
দেশজুড়ে অসংখ্য সাংবাদিক সংগঠন থাকলেও সংকটমুহূর্তে তাদের ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ। উপজেলা পর্যায়ের প্রেস ক্লাবগুলো কি কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ, নাকি সদস্যদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষায় কার্যকর? যদি একজন সাংবাদিক হামলার শিকার হন আর সহকর্মীরা নীরব থাকেন—তবে সেই সংগঠনের অস্তিত্বের যৌক্তিকতা কোথায়?
গ্রামবাংলা ও তথ্যপ্রবাহ—কেন জরুরি
৬৮ হাজার গ্রামের মানুষের কাছে দেশের বাস্তবতা পৌঁছে দেয় গণমাধ্যমই। ইয়াবা, মাদক, চোরাচালান, ভূমি দখল থেকে শুরু করে বিভিন্ন অপরাধের চিত্র প্রথম উঠে আসে স্থানীয় সাংবাদিকদের কলমে। সেই কলম ভেঙে দিলে অন্ধকারই জিতবে। সমাজ তখন গুজবনির্ভর হবে, তথ্যনির্ভর নয়।
কড়া প্রশ্ন, স্পষ্ট জবাব দরকার
দুর্নীতি ও অপরাধের খবর প্রকাশ করা কি অপরাধ?
সত্য প্রকাশে হামলা চালানোরা কি আইনের ঊর্ধ্বে?
সাংবাদিকদের “চাঁদাবাজ” তকমা দিয়ে কারা লাভবান হচ্ছে?
কেন এখনো সাংবাদিক সুরক্ষায় কার্যকর আইন নেই?
করণীয়—শুধু বিবৃতি নয়, বাস্তব পদক্ষেপ
সাংবাদিক সুরক্ষা আইন দ্রুত প্রণয়ন ও কঠোর প্রয়োগ।
হামলার প্রতিটি ঘটনায় বিশেষ ট্রাইব্যুনাল/দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা।
মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা প্রটোকল—সংবাদ সংগ্রহে গেলে পুলিশি সহায়তার স্পষ্ট নীতিমালা।
মিথ্যা অপবাদ (চাঁদাবাজ তকমা) প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থা—ডিফেমেশন নয়, প্রমাণভিত্তিক তদন্ত।
প্রেস ক্লাব ও সংগঠনের জবাবদিহি—সদস্য নির্যাতনে বাধ্যতামূলক অবস্থান ও সহায়তা তহবিল।
ডিজিটাল সুরক্ষা ও সোর্স প্রটেকশন—অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার জন্য নিরাপদ পরিবেশ।
শেষ কথা
সত্যকে থামানো যায় না—ইতিহাস বারবার তা প্রমাণ করেছে। কিন্তু রাষ্ট্র যদি সত্যবাহকদের রক্ষা না করে, তবে সেই ব্যর্থতার দায় রাষ্ট্রকেই নিতে হবে। কলম রক্তাক্ত হলে সমাজ অন্ধ হয়; আর অন্ধ সমাজে অপরাধই নিয়ম হয়ে দাঁড়ায়।
দাবি স্পষ্ট: সাংবাদিকদের নিরাপত্তা, সুরক্ষা ও অধিকার এখনই নিশ্চিত করতে হবে—নইলে “স্বাধীনতা” কেবল স্লোগান হয়েই থাকবে।
Leave a Reply