
আজ’ম খাঁন
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এমন এক নাম, যাঁকে পাশ কাটিয়ে রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বিবর্তন, জাতীয়তাবাদের বিকাশ ও বহুদলীয় রাজনীতির ইতিহাস লেখা কঠিন। তিনি ছিলেন একই সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের একজন সেক্টর কমান্ডার, রাষ্ট্রনায়ক ও রাজনৈতিক সংগঠক। তাঁর উত্থান ঘটেছিল এক গভীর রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে—যে সময় রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখা, প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিকে সচল করা ছিল কঠিন বাস্তবতার অংশ।
রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ
জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনে বাংলাদেশের নিজস্ব ইতিহাস, ভূগোল, সংস্কৃতি, স্বাধীন সত্তা ও জাতীয় স্বার্থকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। এই ধারণা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক মতাদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। জাতীয় পরিচয়ের প্রশ্নে তাঁর এই অবস্থান আজও রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বহুদলীয় রাজনীতির নতুন অধ্যায়
তাঁর শাসনামলের অন্যতম আলোচিত পদক্ষেপ ছিল বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তনের উদ্যোগ। রাজনৈতিক পরিসরে বিভিন্ন মত ও দলের অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হওয়াকে তাঁর সমর্থকেরা গণতান্ত্রিক রাজনীতির পুনরুদ্ধার হিসেবে দেখেন। তবে এ সময়ের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট এবং ক্ষমতার বৈধতা নিয়ে ইতিহাসবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে বিতর্কও রয়েছে। তাই ঘটনাটিকে আবেগ দিয়ে নয়, সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলিলের আলোকে বিচার করা প্রয়োজন।
উন্নয়নের দর্শনে উৎপাদনের অগ্রাধিকার
জিয়াউর রহমানের অর্থনৈতিক চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর। তাঁর শাসনামলে কৃষি, সেচ, খাল খনন, খাদ্য উৎপাদন ও গ্রামীণ কর্মসংস্থানকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। রাষ্ট্রের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরতার পরিবর্তে জনগণকে উৎপাদনমুখী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার চেষ্টা ছিল তাঁর নীতির অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ‘উৎপাদনই অগ্রগতি’—এই ধারণাকে সামনে রেখে তিনি অর্থনীতিকে সচল করার একটি বাস্তবমুখী পথ অনুসন্ধান করেছিলেন।
গ্রামবাংলাকে উন্নয়নের কেন্দ্রবিন্দুতে আনার চেষ্টা
বাংলাদেশের অর্থনীতির মূল ভিত্তি তখনও ছিল কৃষি ও গ্রামীণ জনপদ। ফলে উন্নয়নের সুফল শহরকেন্দ্রিক না রেখে গ্রাম পর্যন্ত পৌঁছানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থান তৈরির উদ্যোগকে এই বৃহত্তর পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো—এসব উদ্যোগ কতটা দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল এবং পরবর্তী সরকারগুলো তার কতটা ধরে রাখতে পেরেছে?
আত্মনির্ভর অর্থনীতির অনুসন্ধান
স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের অর্থনীতি ছিল নানা সংকটে জর্জরিত। খাদ্যঘাটতি, বেকারত্ব, অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও উৎপাদন সংকট ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। এমন বাস্তবতায় জিয়াউর রহমান কৃষি ও উৎপাদন বাড়ানোর পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বেসরকারি উদ্যোগের ভূমিকা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেন। তাঁর অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের সক্ষমতার পাশাপাশি জনগণের কর্মক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে একটি উৎপাদনশীল অর্থনীতি গড়ে তোলা।
নেতৃত্বের শক্তি ও সীমাবদ্ধতা—দুই দিকই দেখতে হবে
জিয়াউর রহমানকে নিয়ে রাজনৈতিক মূল্যায়নে একদিকে যেমন তাঁর নেতৃত্ব, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দৃঢ়তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে, অন্যদিকে তাঁর শাসনামলের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে তীব্র বিতর্কও রয়েছে। সামরিক শাসনের প্রেক্ষাপট, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, সাংবিধানিক পরিবর্তন এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ইতিহাসের আলোচনায় এসেছে। একজন রাষ্ট্রনায়ককে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু অর্জন নয়, তাঁর সময়ের বিতর্কিত সিদ্ধান্তগুলোকেও একই মাপকাঠিতে পর্যালোচনা করা জরুরি।
কেন আজও জিয়াউর রহমান প্রাসঙ্গিক?
আজকের বাংলাদেশে জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা, কৃষি উন্নয়ন ও রাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক হচ্ছে। সেই আলোচনায় জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রচিন্তা আবারও সামনে আসা অস্বাভাবিক নয়। কারণ একটি রাষ্ট্রের অতীত নেতৃত্ব শুধু অতীতের বিষয় নয়; তার নীতি ও সিদ্ধান্ত পরবর্তী রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে।
ইতিহাসের আদালতে আবেগ নয়, প্রয়োজন দলিল
জিয়াউর রহমানকে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি হলো রাজনৈতিক পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে ওঠা। তাঁকে শুধু প্রশংসা করা যেমন ইতিহাসের পূর্ণ পাঠ নয়, তেমনি শুধুমাত্র রাজনৈতিক বিরোধিতার কারণে তাঁর অবদান অস্বীকার করাও নিরপেক্ষ ইতিহাসচর্চা নয়। তাঁর সময়ের সরকারি নথি, অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, উন্নয়ন প্রকল্প এবং প্রত্যক্ষ প্রভাব—সবকিছুকে পাশাপাশি রেখে বিচার করতে হবে।
শেষ প্রশ্ন: কী টিকে আছে সময়ের পরীক্ষায়?
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন ও উন্নয়ন ভাবনার কোন অংশ আজও কার্যকর? কোন উদ্যোগ পরবর্তী বাংলাদেশকে প্রভাবিত করেছে? আর কোন সিদ্ধান্ত সময়ের পরিবর্তনে অচল বা বিতর্কিত হয়ে পড়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে স্লোগান নয়, প্রয়োজন গবেষণা ও তথ্যনির্ভর অনুসন্ধান। কারণ একজন রাষ্ট্রনায়কের প্রকৃত মূল্যায়ন তাঁর প্রতি ব্যক্তিগত ভালোবাসা কিংবা রাজনৈতিক বিরাগ দিয়ে নয়—তাঁর সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল দিয়ে হওয়া উচিত।
ইতিহাস শেষ পর্যন্ত কারও একার সম্পত্তি নয়।
জিয়াউর রহমানও নন। তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়—যেখানে আছে নেতৃত্ব, সাফল্য, বিতর্ক, সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তনের নানা গল্প। তাই তাঁকে মিথ বা বিরোধিতার চোখে নয়, বরং রাষ্ট্রচিন্তা, নীতি, সিদ্ধান্ত ও বাস্তব ফলাফলের আলোকে নতুন করে পাঠ করা প্রয়োজন। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে ন্যায়সংগত প্রশ্ন একটাই—কে কী বলেছিলেন তা নয়, তিনি কী করেছিলেন এবং তাঁর কাজের ফল কী হয়েছিল?
—মোহাম্মদ মাসুদ
লেখক ও কলামিস্ট
Leave a Reply