
স্টাফ রিপোর্টার,
দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম, নির্যাতন ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা একটি দলের ভেতরে এখন তীব্র অসন্তোষ ও বিভাজনের অভিযোগ উঠছে। বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একাংশ দাবি করছেন—দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, তারাই এখন উপেক্ষিত; বিপরীতে নতুন করে যোগ দেওয়া সুবিধাবাদী ‘হাইব্রিড’দের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে।
দলীয় সূত্র ও তৃণমূল নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একসময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের “বাংলাদেশ যাবে কোন পথে—ফয়সালা হবে রাজপথে” স্লোগানকে কেন্দ্র করে সারাদেশে নেতাকর্মীরা ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়েন। গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার, দলীয় চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং রাজনৈতিক অধিকার আদায়ের দাবিতে দীর্ঘ সময় ধরে তারা রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।
তবে সেই আন্দোলনের সময়কার বাস্তবতা ছিল কঠিন। গুম, মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন—এসবের মুখোমুখি হয়ে হাজারো নেতাকর্মী জীবন-জীবিকা ঝুঁকির মধ্যে ফেলেও দলীয় কার্যক্রম চালিয়ে যান। সংশ্লিষ্টদের মতে, “এই ত্যাগ ও সংগ্রামের ধারাবাহিকতাই পরবর্তীতে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পথ তৈরি করে।”
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দলটির ভেতরে ভিন্ন চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তৃণমূলের একাধিক নেতা দাবি করেন, বর্তমানে দলীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ও পরীক্ষিত কর্মীদের চেয়ে আর্থিকভাবে প্রভাবশালী ও নতুন যুক্ত হওয়া ব্যক্তিরাই বেশি প্রাধান্য পাচ্ছেন।
চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত সাবেক ছাত্রনেতা ওসমান আহম্মদ শান্ত বলেন, “গত ১৬-১৭ বছর যারা মামলা-হামলা, জেল-জুলুম সহ্য করে দলকে টিকিয়ে রেখেছে, তাদের অনেকেই এখন অবহেলার শিকার। অনেক ক্ষেত্রে তাদেরকে বোঝা কিংবা প্রতিপক্ষ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে টাকার জোরে আসা ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান দখল করছে।”
তিনি আরও বলেন, “এটা শুধু অন্যায় নয়, দলের আদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যে সংগঠন ত্যাগীদের মূল্যায়ন করে না, সে সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে শক্তিশালী হতে পারে না।”
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও মনে করছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের পর যেকোনো দলে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তৈরি হতে পারে। তবে তা সমাধান না হলে সংগঠন দুর্বল হয়ে পড়ে। তাদের মতে, তৃণমূল ও কেন্দ্রের মধ্যে দূরত্ব কমানো, অভিজ্ঞ কর্মীদের মূল্যায়ন এবং স্বচ্ছ সাংগঠনিক কাঠামো নিশ্চিত করা এখন জরুরি।
এদিকে দলীয় একাধিক সূত্র বলছে, অভ্যন্তরীণ বিভাজন কাটিয়ে উঠতে হলে নেতৃত্বকে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। “সবার আগে বাংলাদেশ”—এই নীতিকে সামনে রেখে দলীয় ঐক্য জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথাও উঠে এসেছে বিভিন্ন মহল থেকে।
ওসমান আহম্মদ শান্ত, যিনি কুসুমপুরা ইউনিয়নের সাবেক ছাত্রদল নেতা এবং চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, বর্তমানে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা জিয়া সাইবার ফোর্সের দপ্তর সম্পাদক (যুগ্ম সম্পাদক পদমর্যাদা) এবং পটিয়া উপজেলা শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদের প্রচার সম্পাদক হিসেবে যুক্ত আছেন। তার দাবি, “ব্যক্তিগত স্বার্থ ও বিভাজন ভুলে দলীয় ঐক্য গড়ে তুলতে না পারলে অর্জনগুলো টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিএনপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—ত্যাগী নেতাকর্মীদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং সাংগঠনিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা। অন্যথায় ভেতরের এই অসন্তোষ ভবিষ্যতে আরও বড় সংকটে রূপ নিতে পারে।
Leave a Reply