— মোঃ আজম খাঁন
লেখক ও কলামিস্ট
চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার ৯ নং (ক) বড়লিয়া ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডের বড়লিয়া খাঁন বাড়ি আমার জন্মভূমি। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা এই জনপদের প্রতিটি অলিগলি, মসজিদ, খানকাহ ও মাজার শরীফের সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমার গভীর আত্মিক সম্পর্ক। ছোটবেলা থেকেই এলাকার অলি-আল্লাহদের দরবারে হাজিরা দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছে। তাই বড়লিয়ার আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য আমার কাছে শুধু ইতিহাস নয়, বরং বিশ্বাস, অনুভূতি ও আত্মিক জীবনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বড়লিয়া ইউনিয়ন শুধু একটি প্রশাসনিক এলাকা নয়; এটি চট্টগ্রামের অন্যতম প্রাচীন আধ্যাত্মিক জনপদ হিসেবে স্থানীয় মানুষের কাছে সুপরিচিত। প্রবীণদের বর্ণনা, স্থানীয় জনশ্রুতি, বিভিন্ন মাজার শরীফ, খানকাহ এবং বংশীয় তথ্য বিশ্লেষণ করলে ধারণা পাওয়া যায় যে, বিভিন্ন সময়ে আরব বংশোদ্ভূত অলি-আল্লাহ, সুফি-দরবেশ ও আওলাদে রাসূল (সা.)-এর বংশধরেরা এই অঞ্চলে আগমন করেছিলেন। তাঁদের দাওয়াত, নৈতিক শিক্ষা ও মানবকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসলামের শান্তির বাণী মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে—এমন বিশ্বাস বহু প্রজন্ম ধরে স্থানীয় সমাজে প্রচলিত।
বর্তমানে বড়লিয়া ইউনিয়নে স্থানীয়ভাবে পরিচিত অন্তত ১৩ জন অলি-আল্লাহর মাজার শরীফ রয়েছে বলে জানা যায়। এছাড়াও সময়ের প্রবাহে পরিচয় হারিয়ে যাওয়া আরও অনেক বুজুর্গের মাজার এ অঞ্চলে ছড়িয়ে রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা। এসব পবিত্র স্থান আজও হাজারো মানুষের জিয়ারত, দোয়া ও আত্মশুদ্ধির কেন্দ্র হিসেবে সমাদৃত।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বাংলার খাজা, অলিকুল সম্রাট, পাঁচ আউলিয়ার সর্দার শাহ সুফি হযরত শাহ হাসান গদা (রহ.), যিনি স্থানীয়ভাবে শাহ গদী (রহ.) নামে অধিক পরিচিত। তাঁর পবিত্র মাজার শরীফ বড়লিয়া ইউনিয়নের বারৈকাড়া গ্রামে অবস্থিত। একই প্রাঙ্গণে তাঁর বড় ভাই শাহ সুফি আহমদ শাহ (রহ.), পিতা, মাতা ও ফুফুর কবরও রয়েছে। এ কারণেই স্থানটি স্থানীয়ভাবে "পাঁচ আউলিয়ার মাজার" নামে সুপরিচিত।
প্রতি বৃহস্পতিবার রাতে অসংখ্য ধর্মপ্রাণ মুসলমান সেখানে সমবেত হন। রাতব্যাপী জিকির, ইবাদত, দোয়া ও ধর্মীয় পরিবেশে মুখরিত থাকে পুরো এলাকা। ফজরের নামাজ শেষে জিয়ারতকারীরা নিজ নিজ গন্তব্যে ফিরে যান। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই দরবারকে কেন্দ্র করে বহু কারামতের ঘটনা যুগের পর যুগ মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত রয়েছে। এসব বিশ্বাস স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্থানীয় জনশ্রুতি অনুযায়ী, শাহ সুফি হযরত শাহ হাসান গদা (রহ.)-এর পূর্বপুরুষদের মধ্যে একজন ছিলেন সুলতানুল আউলিয়া (রহ.)। কথিত আছে, তিনি বড়লিয়ায় পরিবার রেখে ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে বর্তমান মিয়ানমারে গমন করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন। যদিও এ বিষয়ে আরও দলিলভিত্তিক গবেষণা প্রয়োজন, তবুও এ কাহিনি স্থানীয় লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত।
বড়লিয়ার সৈয়্যদ বাড়ির দুই বিশিষ্ট আধ্যাত্মিক সাধক শাহ সুফি হযরত মাওলানা আবদুস সালাম আউলিয়া (রহ.) এবং শাহ সুফি হযরত মাওলানা মাহবুবুর রহমান শাহ (রহ.)-কে স্থানীয়ভাবে শাহ গদী (রহ.)-এর বংশধর হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। শানে গাজীয়ে দ্বীনি মিল্লাত ইমাম শেরে বাংলা শাহ (রহ.) তাঁর রচিত "দেওয়ানে আজিজিয়া" গ্রন্থে হযরত আবদুস সালাম আউলিয়া (রহ.)-এর মর্যাদা ও আধ্যাত্মিক অবস্থান সম্পর্কে উল্লেখ করেছেন বলে জানা যায়।
আমার মরহুম পিতা প্রায়ই বলতেন, হযরত আবদুস সালাম আউলিয়া (রহ.) ছিলেন মহান আল্লাহর এক বিশেষ ওলি। তাঁর জীবনের বহু কারামতের কথা স্থানীয়দের মুখে আজও শোনা যায়। এসব ঘটনা বিশ্বাসের বিষয়, যা ধর্মীয় অনুভূতির অংশ হিসেবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে চলে আসছে।
আমি ব্যক্তিগতভাবে বড়লিয়া ছাগলামি দরবার শরীফ ও বড়লিয়া রহমানিয়া দরবার শরীফে নিয়মিত উপস্থিত হয়ে এই মহান সাধকদের নূরানি কদমে শ্রদ্ধাভরে সালাম জানাই। আমার বিশ্বাস, যারা অলি-আল্লাহদের প্রতি ভালোবাসা ও সম্মান ধারণ করেন, তারাই এ ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করতে পারেন।
শাহ সুফি হযরত মাওলানা মাহবুবুর রহমান শাহ (রহ.)-এর সঙ্গে আমার পারিবারিক ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত গভীর। আমি তাঁকে স্নেহভরে "নানা হুজুর" বলে সম্বোধন করতাম। কারণ তিনি ছিলেন আমার বাবা-মায়ের পীর সাহেব। তাঁর ইন্তেকালের পর তাঁর জীবন, কর্ম ও কারামত নিয়ে প্রথম জীবনীগ্রন্থ প্রকাশ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তবে আমাদের ব্যক্তিগত আত্মিক সম্পর্কের কিছু বিষয় তাঁর নির্দেশেই ব্যক্তিগত পরিসরেই সংরক্ষিত রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, তাঁর পিতৃসূত্রে বংশ শাহ গদী (রহ.)-এর সঙ্গে এবং মাতৃসূত্রে বারৈকাড়ার শাহ সুফি সৈয়্যদ কুতুব শাহ (রহ.)-এর বংশের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। এসব তথ্য স্থানীয় বংশীয় ঐতিহ্য ও জনশ্রুতির অংশ হিসেবে বিবেচিত।
ইতিহাসবিদদের মতে, বাংলায় ইসলামের বিস্তারে সুফি-সাধক ও অলি-আল্লাহদের অবদান ছিল অনন্য। তাঁরা শুধু ধর্ম প্রচার করেননি; বরং ন্যায়, মানবতা, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব, সহমর্মিতা ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠায় অসামান্য ভূমিকা রেখেছেন। তাঁদের শান্তিপূর্ণ দাওয়াত ও মানবিক আচরণ বহু মানুষকে ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট করেছিল।
বড়লিয়ার বিভিন্ন মাজার, খানকাহ, প্রাচীন মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান আজও সেই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারের জীবন্ত সাক্ষ্য বহন করছে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার আশেকে রাসূল, ভক্ত ও জিয়ারতকারী এসব পবিত্র স্থানে আসেন। অনেকের বিশ্বাস, আন্তরিক দোয়া ও আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনার মাধ্যমে এখানে আত্মিক প্রশান্তি লাভ করা যায়।
গ্রামের নাম "বড়লিয়া" নিয়েও রয়েছে একটি বহুল প্রচলিত জনশ্রুতি। অনেকের মতে, "বড় আউলিয়া" শব্দটি উচ্চারণগত পরিবর্তনের মাধ্যমে "বড়লিয়া" নাম ধারণ করেছে। যদিও এ দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য লিখিত ঐতিহাসিক প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি, তবুও এটি স্থানীয় লোকঐতিহ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।
আজ সময়ের দাবি—বড়লিয়ার এই সমৃদ্ধ আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যকে দলিলভিত্তিক গবেষণার মাধ্যমে সংরক্ষণ করা। প্রবীণ ব্যক্তিদের সাক্ষাৎকার, বংশলতিকা, প্রাচীন শিলালিপি, মাজার ও খানকাহ-সংক্রান্ত নথি সংগ্রহ করে একটি নির্ভরযোগ্য ইতিহাস রচনা করা প্রয়োজন। পাশাপাশি মাজার শরীফসমূহে যাতায়াতের সড়ক উন্নয়ন, অবকাঠামো, পরিচ্ছন্নতা ও দর্শনার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বড়লিয়া কেবল একটি গ্রামের নাম নয়; এটি আধ্যাত্মিকতা, ইতিহাস, বিশ্বাস ও ইসলামের শান্তির বাণী প্রচারকারী সাধক-পুরুষদের স্মৃতিবিজড়িত এক ঐতিহাসিক জনপদ। এই ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। গবেষণা, দলিল সংরক্ষণ, ধর্মীয় মর্যাদা রক্ষা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সঠিক ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার মধ্য দিয়েই বড়লিয়া তার প্রকৃত গৌরব নিয়ে আরও সুপ্রতিষ্ঠিত হতে পারে।
আমি নিজেকে এই পবিত্র জনপদের একজন ক্ষুদ্র খাদেম এবং অলি-আল্লাহদের একজন ভালোবাসার মানুষ হিসেবে মনে করি। মহান আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের দরবারে ছোটবেলা থেকে আজ পর্যন্ত হাজিরা দেওয়ার যে সৌভাগ্য তিনি আমাকে দান করেছেন, তার জন্য আমি সর্বদা শুকরিয়া আদায় করি। আল্লাহ তাআলা যেন এই আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকার যুগের পর যুগ অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং আমাদের সবাইকে তাঁর নেক বান্দাদের আদর্শ অনুসরণ করার তাওফিক দান করেন। আমীন।